+8801533443118 Info@bestaidbd.com

কৃমি হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বৃহৎ পরজীবী। এটি মানুষের দেহে বাস করে এবং শরীর থেকে খাবার গ্রহণ করে বেচে থাকে এবং বংশ বৃদ্ধি করে। কৃমি অনেক ধরনের আছে । আমাদের দেশে কেঁচো কৃমি, বক্র কৃমি, চাবুক কৃমিতে আক্রান্তের হার বেশী। স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্রিনের অভাব, পরিষ্কার ও নিরাপদ পানীয় জলের অভাব এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব কৃমি রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ।


কৃমি কিভাবে ছড়ায়:
স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা না থাকার কারণে বা কাঁচা পায়খানা, নদীতে, খালে, উন্মুক্ত স্থানে মল ত্যাগ করার কারণে পানি ও মাটিতে কৃমির ডিম ছড়িয়ে পড়ে। এসব মাটিতে ও পানিতে উৎপন্ন শাক-সবজি ও ফলমূল কাচা খেলে অথবা কৃমির ডিম বাহিত দূষিত পানি পান করলে কৃমির সংক্রমণ ঘটে। এছাড়া খালি পায়ে হাটার ফলে পায়ের নিচ দিয়ে হুক ওয়ার্ম বা বক্র কৃমির লার্ভা শরীরে প্রবেশ করে কৃমি রোগ সৃষ্টি করে।


সুতা কৃমি (Pin Worm):
পৃথিবীর সর্বত্রই সবচেয়ে বেশী সংক্রমণ করে সুতা কৃমি। সুতা কৃমি ২ থেকে ১২ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের সাদা সুতার মতো চিকন। খাবারের সাথে পেটে গিয়ে সুতা কৃমি ক্ষুদ্রান্ত্রে অবস্থান করে। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্ক সুতা কৃমি বৃহদান্ত্রের কোলনেই বেশী পাওয়া যায়। স্ত্রী কৃমি রাতের দিকে মলদ্বারের বাইরে এসে ডিম পাড়ে ও কামড়ায় ফলে মলদ্বার চুলকায়। সুতা কৃমি মেয়েদের প্রস্রাবের দ্বারে চলে যেতে পারে ফলে সেখানে চুলকায়। যখন চুলকায় তখন তার আঙ্গুলের ভাজে ও নখের মধ্যে কৃমির ডিম ঢুকে যায়। তাছাড়া জামা-প্যান্ট, বিছানার চাদরে ও কৃমির ডিম লেগে যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি যে হাত দিয়ে মলদ্বার চুলকায় সে হাত দিয়ে কিছু খেলে বা মুখে ধরলে বা ঐ নোংরা হাত দিয়ে তৈরি করা খাবার অন্যরা খেলে কৃমিতে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে রাতে মলদ্বারে চুলকানি বেশী হয়। মলদ্বারে চুলকানি থেকে শিশুর ঘুমের অসুবিধা হতে পারে। তাছাড়া পেটে গোলমাল থেকে যায়। কখনো কখনো অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা হতে পারে। কারো কারো খাবারের রুচি চলে যায়।


কেঁচো কৃমি (Round Worm):
দেখতে কেঁচোর মতো এবং পরিণত অবস্থায় ৬ থেকে ১৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। কেঁচো কৃমির রং হালকা হলুদ। সাধারণত অপরিষ্কার শাক-সবজি, ফলমূল, নোংরা খাবার, দূষিত পানির মাধ্যমে কেঁচো কৃমির ডিম আমাদের মুখে প্রবেশ করে। সেখান থেকে খাদ্যনালীর ক্ষুদ্রান্ত্রে এ ডিম চলে যায় এবং ক্ষুদ্রান্ত্রেও এনজাইম বা পাচকরসের মাধ্যমে ডিম থেকে লার্ভা বের হয়। লার্ভাগুলো রক্তের মাধ্যমে যকৃত, হৃৎপিণ্ডে এবং ফুসফুসে প্রবেশ করে। এরপর ফুসফুসের এলভিওলাই ছিদ্র করে শ্বাসনালী দিয়ে অন্ননালী পার হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করে ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে পূর্ণতা লাভ করে এবং ডিম পাড়ে। পরিণত স্ত্রী কৃমি দৈনিক প্রায় ২ লক্ষ ডিম মানুষের মলের সাথে নিষ্কাশন করে। হাত-পা ঠিকমতো না ধুলে নখের মধ্যে বা আঙ্গুলের ভাঁজে লেগে থাকা ডিম এবং অপরিষ্কার খাবার ও পানির মাধ্যমে আমাদের মুখে প্রবেশ করে। অর্থাৎ কেঁচো কৃমির সংক্রমণ ঘটে। কেঁচো কৃমির সংক্রমণে কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে নানা রকম লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। অন্ত্রে বেশী কৃমি থাকলে অস্বস্তি ভাব, পেট ফাঁপা, পেট ফুলে উঠা, বদহজম, ক্ষুধামন্দা বা অরুচি, বমি বমি ভাব, ওজন কমে যাওয়া, পাতলা পায়খানা , আম মিশ্রিত মল, শুকনো কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসে দুর্গন্ধ, যকৃত প্রদাহ ইত্যাদি হতে পারে। কেঁচো কৃমি কখনো কখনো পিত্তনালী ও অগ্নাশয় নালীতে গিয়ে নালী বন্ধ করে জন্ডিস, এপেন্ডিক্সে গিয়ে আটকে যেয়ে এপেন্ডিসাইটিস এবং সর্বোপরি একত্রে কয়েকটি জড়ো হয়ে পরিপাক নালী আটকিয়ে ইন্টেসটিনাল অবস্ট্রাকসনের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের মানুষের বিশেষ করে শিশুদের অপুষ্টির প্রধান কারণ হলো কেঁচো কৃমির সংক্রমণ।


বক্র কৃমি (Hook Worm):
হুক ওয়ার্মেও মুখে হুক বা বড়শির মতো চারটি দাঁত রয়েছে এবং ২-৬ ইঞ্চি লম্বা সবুজাভ-সাদা রং এর হয়ে থাকে। বক্র কৃমির ডিম মলের সঙ্গে বেরিয়ে আসে পরে আর্দ্র ভেজা মাটিতে লার্ভায় পরিণত হয় এবং সংক্রমণ করার উপযুক্ত হয়। মাটিতে বা ঘাসে লেগে থাকা বাচ্চা কৃমি সাধারণত: পায়ের তলার চামড়া ফুটো করে শরীরে প্রবেশ করে এবং ফুসফুসে যায়।ফুসফুস থেকে শ্বাসনালী হয়ে অন্ননালীর ক্ষুদ্রান্ত্রে এসে পূর্ণতা পায় এবং অনবরত ডিম পাড়ে। যারা খালি পায়ে টয়লেটে রাস্তায় মাঠে হাটা চলা করে তাদেও বক্র কৃমি বেশী হতে দেখা যায়। বিশেষত গ্রাম গঞ্জের মাঠেঘাটে মল ত্যাগের প্রবণতা বেশী বলে সেখানেই এ কৃমির সংক্রমণ বেশী। বক্র কৃমি ক্ষুদ্রান্ত্রে তার হুকের সাহায্যে রক্ত চোষে এবং রক্ত খেয়েই বেঁচে থাকে। একটি বক্র কৃমি প্রতিদিন প্রায় ০.২ মিঃ লি: রক্ত খায়। বক্র কৃমির সংক্রমণের লক্ষণ সাধারণত: রক্তক্ষয় দুর্বলতা জনিত রোগ হিসেবে প্রকাশ পায়। বুক ও পেটের ব্যথা, বমি অনেকটা পেপটিক আলসার রোগীর মতো মনে হয়। এছাড়া রক্ত মিশ্রিত কাশি। প্রায় পাতলা পায়খানা, রক্তশূন্যতা আমিষ স্বল্পতা, এমনকি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধা প্রাপ্ত হতে পারে বিশেষ করে যারা কম খাবার খায়। বক্র কৃমি পায়ের তালুর চামড়া ফুটো করে প্রবেশ করায় পায়ের তালুর ত্বকে ইনফেকশন দেখা দেয় এবং পায়ের তালুতে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি করে।


ফিতা কৃমি (Tape Worm):
ফিতা কৃমি দেখতে ফিতার মতো ৫ থেকে ২৫ ফুট বা আরো বেশী লম্বা হয়। ছোট্ট মাথার সাথে অসংখ্য খণ্ড (শসার বীচির মতো) একটি সাথে আরেকটি যুক্ত হয়ে এ কৃমির দেহ গঠিত। সাধারণত পেটে একটি মাত্র ফিতা কৃমি থাকে তবে বেশীও থাকতে পারে। ফিতা কৃমি ক্ষুদ্রান্ত্রে থেকে ডিম পাড়ে। মানুষের মলের সাথে ফিতা কৃমির ডিম মাটিতে পড়ে থাকে কিংবা ঘাসে লেগে থাকে। মাঠে চরার সময় গরু, মহিষ, শুকর, এ ডিম গুলো খেয়ে ফেললে গরু, শুকরের অন্ত্র ভেদ করে লার্ভা দেহের অন্যত্র যায় এবং সিস্ট হয়ে মাংস পেশীতে বেঁচে থাকে। মানুষ অসিদ্ধ বা অর্থ সিদ্ধ সিস্টযুক্ত গরুর বা শূকরের মাংস খেয়ে সংক্রমিত হয়। যারা খুব বেশী শিক কাবাব খায় তাদেও এ রোগ হবার আশংকা বেশী অন্ত্রে ফিটা কৃমি থাকলে কখনো কখনো পেটে ব্যথা হতে পারে। কৃমির লেজের দিক থেকে কিছু খণ্ড যা দেখতে অনেকটা শসার বিচির মতো মলের সাথে বেরিয়ে আসে। বিপদ দেখা দেয় যখন ফিতা কৃমি মানুষের ব্রেনে বা মস্তিষ্কে ফিতাকৃমি সিস্ট তৈরি করে। এ শিষ্টগুলো মাথা ব্যথা, খিঁচুনি, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।


প্রতিরোধ (Prevention):
যেহেতু প্রতিরোধ চিকিৎসার তুলনার অধিকতর ভালো তাই প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত।
জন্মেও পর ৫ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো।
খাবার তৈরি, পরিবেশন, খাওয়ার পূর্বে এবং মল ত্যাগ করার পরে সাবান বা ছাই দিয়ে হাত ভালো ভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।
নিয়মিত গোসল করা, পরিষ্কার জামা-কাপড় পড়া এবং বড় হবার আগে অবশ্যই নখ কেটে ফেলা।
শিশুর সুতা কৃমি হলে সুতির জাঙ্গিয়া পরিয়ে শোয়ানো উচিত যাতে সে মলদ্বার হাত দিয়ে না চুলকাতে পারে।
খালি পায়ে মাঠে রাস্তায় বা পায়খানায় না যাওয়া।
অসিদ্ধ বা অর্ধ সিদ্ধ মাংস না খাওয়া